এখন যখন আমরা মৌসুমের প্রথম আন্তর্জাতিক বিরতি উপভোগ করছি, তার আগেই কিন্তু প্রিমিয়ার লীগের এবারের ২০২২-২৩ মৌসুমটি পুরোপুরিভাবে জমে উঠেছে। এখন পর্যন্ত ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটি তাদের স্বভাবসুলভ দানবীয় মানসিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য, তারা ব্যতীতও বেশ কিছু আর্লি ফ্রন্টরানার্সও আবির্ভূত হয়েছে এবারের মৌসুমে।

মূদ্রার অপর পৃষ্ঠে নজর দিলে দেখা যায় যে, লীগটিতে এমন বড় দলের সংখ্যাও মোটেই কম নয় যারা কি না খুবই বাজেভাবে আন্ডারপারফর্ম করে যাচ্ছে, অর্থাৎ নিজেদের সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে, তারও নিচে অবস্থান করছে ব্রেন্ডান রজার্স এর লেস্টার সিটি দলটি। ২০১৫-১৬ প্রিমিয়ার লীগ মৌসুমের শিরোপাজয়ী দলটি বর্তমানে লীগ টেবিলের একদম তলানিতে রয়েছে। ৭টি ম্যাচ খেলে তারা এ পর্যন্ত অর্জন করেছে মাত্র ১টি পয়েন্ট। লীগের সবচেয়ে বাজে ডিফেন্স তাদেরই, কারণ এ পর্যন্ত মোট ২২টি গোল তারা হজম করেছে, যা লীগে সর্বোচ্চ। তবে, আক্রমণভাগে তারা ততটাও খারাপ পারফর্ম করেনি, যেহেতু ১০টি গোল করে তারা ১১তম পজিশনে থাকা লিডস ইউনাইটেডের গোল ট্যালিকে ছুঁতে পেরেছে।

যদিও আমরা আমাদের প্রাক মৌসুম প্রেডিকশন পোস্টে ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছিলাম যে এবারের মৌসুমে লেস্টার সিটি’র রেলিগেটেড হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, তারপরও ব্রেন্ডান রজার্স এর অধীনে থাকা একটি দলের নিকট হতে এত অগোছালো এবং ভারসাম্যহীন ডিফেন্স অবলোকন করে আমরা সকলেই হতভম্ব।

ফক্সেস খ্যাত লেস্টার সিটি তাদের মৌসুমের সূচনা করেছিল ব্রেন্টফোর্ডের বিরুদ্ধে একটি ২-২ গোলের ড্র দিয়ে। সেই পয়েন্টটিই হল এখন পর্যন্ত তাদের এবারের মৌসুমে অর্জিত একমাত্র পয়েন্ট। প্রায় এক ঘন্টার মত সময় ধরে অসাধারণ ফুটবল খেলার পর, এবং ২ গোলের একটি বড়সড় লিড নেওয়ার পর তারাও নিশ্চয় ভেবেছিল যে ম্যাচটি তাদের দখলে পুরোপুরিভাবেই চলে এসেছে। তবে, খেলার শেষের ৩০ মিনিটে চাপের মুখে তাদের ডিফেন্স সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে, এবং মুহূর্তের মধ্যেই ব্রেন্টফোর্ড গোল দুইটি পরিশোধ করে দিতে সক্ষম হয়। 

এরপর তারা মোট ৬টি ম্যাচ খেলে একটিতেও কোন পয়েন্ট অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে তিনটি ম্যাচে তারা প্রথমে গোল করেও ম্যাচ হেরেছে। এছাড়া, চেলসি’র বিরুদ্ধে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় জুড়ে একজন খেলোয়াড় বেশি নিয়ে খেলে এবং এক গোলে এগিয়ে গিয়েও তারা ম্যাচটি হেরে যেতে সক্ষম হয়।

তবে, জেমি ভার্ডি এবারের মৌসুমে এখন পর্যন্ত একটি গোল না পেলেও গোল করা নিয়ে তাদের কোন সমস্যা নেই, কারণ অসাধারণ ফর্মে থাকা জেমস ম্যাডিসন ইতিমধ্যে ৩টি গোল ও একটি এসিস্ট তুলে নিয়েছেন, এবং দল হিসেবে লেস্টার সিটিও মোট ১০টি গোল করতে সক্ষম হয়েছে, যা কোন অংশেই কম নয়। চলমান মৌসুমে তারা শুধুমাত্র একটি ম্যাচেই গোল করতে অক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের মূল সমস্যা তাদের রক্ষণভাগ ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড নিয়ে, কারণ তারা মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যায় গোল হজম করেছে।

পড়ুন:  বিগ সিক্সের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা খরা কার?

এছাড়া, গোল পোস্টের নিচে ড্যানি ওয়ার্ডও এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, তিনি প্রিমিয়ার লীগ পর্যায়ে একজন উচ্চ মানের গোলকিপার, কারণ তার খেলা দেখে মনেই হয় না যে তিনি মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। মূলত এজন্যই ৭ ম্যাচ খেলে তাদের হজম করা ২২ গোল হচ্ছে তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ, এবং এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সূচনা।

মৌসুমের শুরু থেকেই অবশ্য ফক্সেস’দের নর্দার্ন আইরিশ ম্যানেজার বিভিন্ন ফর্মেশনে খেলার চেষ্টা করেছেন, এবং রক্ষণভাগেও নানা ধরণের কম্বিনেশন যাচাই করে দেখেছেন, কিন্তু তার কোন ট্যাকটিক্সই যেন কাজ করছে না। এবারের মৌসুমে তো বটেই, গত মৌসুমেও তাদের দখলেই ছিল সেট পিস পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বাজে ডিফেন্স এর রেকর্ড।

 

লেস্টার সিটি’র এমন অধঃপতনের কারণ কি? (Why are Leicester City in decline?)

২০১৫-১৬ সালের প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেছে মূলত এই বিষয়টির জন্য যে, প্রিমিয়ার লীগই হোক বা ইউরোপীয় কোন প্রতিযোগিতা, তারা সবসময়ই বড় বড় সব ক্লাবকে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখতো। ব্রেন্ডান রজার্স এর তৈরি করা একটি পূর্ণাঙ্গ দল নিয়ে বেশ কিছু বছর ধরে অসাধারণ লড়াই দিয়ে যাওয়ার পর, এবং বেশ কিছু বার অল্পের জন্য শীর্ষ চারের বাইরে থেলে যাওয়ার পর, এবার তাদের ভাগ্য অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। 

কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামের দলটি অবশ্য গত মৌসুমে কোন ইউরোপীয় স্পটই দখল করতে পারেনি। এরপর গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করার ফলে এবং বেশ কিছু বড় বড় খেলোয়াড়দের হারানোর পরে তাদের অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে পড়ে। ট্রান্সফার উইন্ডোটিতে তারা কেবলমাত্র একজন খেলোয়াড় এর উপর ১৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে, যিনি হলেন ডিফেন্ডার উত ফায়েস। এত কম খরচের পরেও বছর শেষে তাদেরকে প্রায় ১২০ মিলিয়ন পাউন্ডের ক্ষতি গুনতে হবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে।

প্রথমত, তাদের অতীতের দূর্বল জায়গাগুলি শক্তিশালী করার জন্য তারা তেমন কোন নতুন সাইনিং দলে ভেড়াতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তাদের বেশ কিছু ফার্স্ট চয়েজ এবং গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়েরা এমন সময়েই ইঞ্জুরিতে পড়েছেন। তার উপর আবার তাদের দলের সবচেয়ে ভরসাবান দুই কান্ডারি (গোলকিপার) ক্যাস্পার স্মাইকেল এবং (ডিফেন্ডার) ওয়েসলি ফোফানা ক্লাব ছেড়ে চলে গিয়েছেন, যা তাদেরকে আরো দূর্বল করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে মাঠে এবং মাঠের বাইরে লেস্টার এর বেশ বাজে একটা সময় চলছে, এবং তার ফলে অনেকেই তাদেরকে রেলিগেশনের জন্য ফেভারিটসও মানছেন।

পড়ুন:  ম্যাচউইক পুরস্কার

ব্রেন্ডান রজার্স এর জাদু দেখার জন্য অনেক অপেক্ষা করলেও লেস্টার সমর্থকরা সেটির দেখা পাচ্ছেন না, কারণ অনেক পন্থা অবলম্বন করেও রজার্স দলটিতে আগুনের ফুলকি তৈরি করতে পারছেন না। তাই, এমনটি বলাই যায় যে, ২০১৪ সালে (৮ বছর আগে) প্রিমিয়ার লীগে ফেরার পর থেকে লেস্টার সিটিকে যে লড়াইয়ের মুখোমুখি একবারও হতে হয়নি, সেই রেলিগেশন লড়াইয়েই এবার সামিল হতে যাচ্ছে ফক্সেস’রা। 

তবে, প্রিমিয়ার লীগের নাটকীয়তা কখনোই থেমে থাকবে না, এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সকল চেষ্টাই করতে হবে ইস্ট মিডল্যান্ডস এর ক্লাবটিকে। কিন্তু, এটি না বললেই নয় যে, লেস্টার সিটি’র ম্যানেজার পদে ব্রেন্ডান রজার্স এর বিদায় ঘন্টা এখন শুধু বেজে ওঠার অপেক্ষাতেই রয়েছে।

 

সময় এসেছে ব্রেন্ডান রজার্স এর বিদায় নেওয়ার (Time for Brendan Rodgers to depart)

প্রিমিয়ার লীগে পর পর ৬টি ম্যাচে হারার পর লেস্টার সিটি’র নর্দার্ন আইরিশ কোচ ব্রেন্ডান রজার্স প্রচন্ড চাপের মুখে রয়েছেন। তাদের সর্বশেষ ম্যাচে তারা একটি শক্তিশালী টটেনহ্যাম হটস্পার্স দলের বিপক্ষে ৬-২ গোলে ধরাসয়ী হয়েছে। ১৯৮৩ সালের পর থেকে এটিই কোন মৌসুমে তাদের সবচেয়ে বাজে সূচনা।

টটেনহ্যাম হটস্পার্স এর নিকট ধরাসয়ী হওয়ার আগে তারা ব্রাইটন এন্ড হোভ এলবিয়ন এর নিকটও প্রায় একই রকম লজ্জার শিকার হয়েছিল। ৫-২ গোলের ব্যবধানে হারা সেই ম্যাচটিতে অবশ্য তারা দুইবার সমতা ফেরাতে পেরেছিল। কিন্তু স্পার্স এর বিরুদ্ধে তারা সেটিও করতে পারেনি। 

স্পার্সের নিকট নাকানিচুবানি খাওয়ার পর প্রেস কনফারেন্সে ব্রেন্ডান রজার্স বলেন, “আমি জানি ফুটবল এর দুনিয়া কিভাবে কাজ করে, এবং আমি এটিও জানি যে আমাদের সমর্থকরা নিশ্চয় আমাদেরকে নিয়ে খুবই হতাশ ও লজ্জিত। আমি সেখান থেকে লুকাতে পারি না, কারণ আমি ক্লাবটির ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক।”

তিনি আরও বলেন, “গত ছয় ম্যাচে টানা পরাজয়ের রেকর্ডটিও খুবই দুঃখজনক। তবে, লেস্টার সিটি যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক না কেন, আমি চিরজীবন এই ক্লাবটিকে সম্মান দিয়েই যাব, এবং শ্রদ্ধার নজরেই দেখে যাব।”

পড়ুন:  চেলসি'র চলমান দুর্গতিঃ গ্রাহাম পটারকে কি চাকরিচ্যুত করা উচিত?

পরিবর্তন এখন যেন সময়ের দাবি, এবং চলমান আন্তর্জাতিক বিরতিটি লেস্টার কর্তৃপক্ষকেও বেশ খানিকটা সময় দিয়েছে ক্লাবটিতে ব্রেন্ডান রজার্স এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসার। এছাড়া, তারা এই অবসরে নিশ্চয় এটিও ভেবে দেখবেন যে, বর্তমান বাজারে ম্যানেজার হিসেবে রজার্স এর বিকল্প হিসেবে তাদের নিকট কি কি অপশন রয়েছে।

 

রজার্স এর পদটি দখল করার জন্য যারা ফেভারিটস (Favourites to replace Brendan Rodgers)

বিভিন্ন সূত্র অনুসারে জানা গিয়েছে যে, লেস্টারের ডাগ আউটে ৪৯ বছর বয়সী রজার্সকে রিপ্লেস করার জন্য ফক্সেস কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে পছন্দের বিকল্প হলেন বর্তমান ব্রেন্টফোর্ড কোচ থমাস ফ্র‍্যাংক। তবে, তাকে যদি তারা দলে ভেড়াতে না পারে, তাহলে তারা সাবেক বার্নলি কোচ শন ডাইশকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারে বলেই জানা যাচ্ছে। 

উপরে উল্লিখিত উভয় ম্যানেজারেরই ক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে কম বাজেটের মধ্যেই লেস্টারকে আবারো শক্তিশালী করে তোলার, এবং জয়ের ধারায় ফিরিয়ে আনার। 

তবে, ব্রেন্ডান রজার্সকে চাকরিচ্যুত করাটাও লেস্টারের জন্য লাভজনক হবে না, কারণ তিনি ক্লাবটির সাথে আরো তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ রয়েছেন, তাও আবার ২০০,০০০ পাউন্ডের সাপ্তাহিক বেতনসহ। তাকে চাকরিচ্যুত করতে গেলে লেস্টারকে ব্যয় করতে হবে আরো ১০ মিলিয়ন পাউন্ড। সেটি তাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ উয়েফার “ফাইনানশিয়াল ফেয়ার প্লে রুল” অমান্য করলে তাদেরকে বড় ধরণের মাশুল দিতেও হতে পারে।

লেস্টারের এই দুর্দশা ও শোচনীয় পরিস্থিতির জন্য অবশ্য শুধুমাত্র ব্রেন্ডান রজার্সকে একা দায়ী করলে চলবে না, কারণ তার পরিকল্পনা মোতাবেক তাকে নতুন সাইনিং এনে দিতে পারেনি ফক্সেস কর্তৃপক্ষ। তবুও, এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ম্যানেজারদেরকেই দায়ী করা হয়, এবং তাদের চাকরিই সবচেয়ে বেশি হুমকির মধ্যে থাকে। তাই, এক্ষেত্রেও লেস্টার থেকে রজার্সের বিদায়ের সম্ভাবনাই অনেকটা বেশি।

এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে যে, যেখানে লেস্টার এবারের মৌসুমে খুবই বাজে সূচনা করেছে, ঠিক সেখানেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কিন্তু তার চেয়ে অনেক ভালো সূচনা করতে সক্ষম হয়েছে। এমনটি চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই তারা রেলিগেশন থেকে বাঁচার লড়াইয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে পড়বে। তাই, এখন তাদের সামনে একটি পথই খোলা রয়েছে — নিজেদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া এবং জয়ের ধারায় ফিরে আসা। এই পথটি তাদের জন্য যেমন দুর্গম হতে চলেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দুর্গম হতে চলেছে তাদের কোচ ব্রেন্ডান রজার্স এর জন্য।

Share.

Leave A Reply