২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি, এবং খ্যাতনামা এই টুর্নামেন্টটি শুরুর আগে তাই সেটি নিয়ে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।

    ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতাটির বিশেষ বিশেষ কিছু দিক নিয়ে সকল ফুটবল ভক্তরাই যেমনি উত্তেজিত, তেমনি শঙ্কিতও বটে। এটি হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ। এবং শুধু তাই নয়, এটি শীতকালে অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপও হতে চলেছে। ইতিমধ্যে এই ইভেন্টটিকে কেন্দ্র করে কাতার সরকার অনেক অর্থ খরচ করেছে, যার সিংহভাগই গিয়েছে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বানানো তাদের নতুন স্টেডিয়ামগুলির পেছনে।

    এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে কাতারের ৮টি উচ্চমানের স্টেডিয়ামে, যা কি না ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের পর থেক্র স্টেডিয়ামের সংখ্যার দিক দিয়ে সর্বনিম্ন। আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস জুড়ে এই যে ৮টি স্টেডিয়ামে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরটি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, সেই স্টেডিয়ামগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করাই আজকে আমাদের লক্ষ্য। চলুন, শুরু করা যাক।

    আল জানুব স্টেডিয়াম (Al Janoub Stadium)

    ৪০,০০০ আসনের এই বিশাল ও মনোরম স্টেডিয়ামটি উদ্বোধন করা হয় ২০১৯ সালের মে মাসে। এটি অবস্থিত কাতারের আল ওয়াকরাহ্ শহরে, যা কি না মধ্য দোহা থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। স্টেডিয়ামটির নকশা করেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ-ইরাকি আর্কিটেক্ট জাহা হাদিদ। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ এর এই ভেন্যুটির ডিজাইনটি তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী ধৌ নৌকার নকশার সাথে মিল রেখে, যে ধরণের নৌকা ব্যবহার করে থাকেন অত্র এলাকার মুক্তো ব্যবসায়ীরা।

    এর কার্ভি-লিনিয়ার আকৃতির ছাদ ও এক্সটেরিয়র আল ওয়াকরাহ্ এর ঐতিহাসিক সামুদ্রিক জলপথেরই প্রতীক, যা কি না স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদেরও এমনি অনুভব করাবে যেন তারা একটি জাহাজে বা নৌকায় বসে খেলাটি দেখছেন। এর বাইরের দিকের আকাবাকা বিমগুলি এটির ছাদের ভর গ্রহণ করে, এবং পুরো স্টেডিয়ামটিকে একটি জাহাজের কাঠামো হিসেবে তুলে ধরে।

    পড়ুন:  Atalanta Rasmus Hojlund-এর জন্য Man Utd-এর প্রস্তাবে নতুন জিজ্ঞাসার মূল্য সহ সাড়া দেয়

    খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম (Khalifa International Stadium)

    এই স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন হয় ১৯৭৬ সালে। তারপর থেকে বেশ কয়েকবার এটির মেরামত কাজ সম্পন্ন হয়, এবং শেষমেষ ২০১৭ সালে এসে এটিকে পুনরায় একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয় এবং পুনঃউদ্বোধনও করা হয়। এটি মধ্য দোহা থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে আল রাইয়ান শহরে অবস্থিত, এবং এমনটি বলাই যায় যে, এটিই কাতারের সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম।

    খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতাও ৪০,০০০ এবং এই মাঠটিতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশী বিদেশী বড় মাপের টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল এশিয়ান গেমস, গাল্ফ কাপ, এবং এএফসি এশিয়ান কাপ ইত্যাদি।

    এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম (Education City Stadium)

    আল রাইয়ান শহরে কাতার ফাউন্ডেশন এর বিখ্যাত এডুকেশন সিটি নামক এলাকায় অবস্থিত এই আধুনিক স্টেডিয়ামটি মধ্য দোহা থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রতিষ্ঠিত। ৪০,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামটি ২০২০ সালের জুন মাসে একটি ডিজিটাল ইভেন্ট এর মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয়।

    এই স্টেডিয়ামটি হল কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব, কারণ এই স্টেডিয়ামটি তৈরির উপকরণগুলির মধ্যে ২০ শতাংশই ছিল সবুজ উপকরণ। ২০১৯ সালে এটি জিএসএএস (গ্লোবাল সাস্টেইনেবিলিটি এসেসমেন্ট সিস্টেম) এর নিকট হতে একটি ফাইভ স্টার (পাঁচ তারকা) রেটিংও অর্জন করে।

    আল থুমামা স্টেডিয়াম (Al Thumama Stadium)

    অত্যাধুনিক এই আল থুমামা স্টেডিয়ামটি অবস্থিত মধ্য দোহা থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে, অর্থাৎ বিখ্যাত আল থুমামা শহরে। ২০২১ সালের অক্টোবরে আমির কাপ ফাইনালের পরে এই স্টেডয়ামটি উদ্বোধন করা হয়, যে ম্যাচটিতে আল রাইয়ানকে পেনাল্টি শুট আউটে হারিয়ে দেয় আল সাদ।

    খ্যাতনামা কাতারি আর্কিটেক্ট ইব্রাহিম এম জাইদাহ্ এই ৪০,০০০ দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ানটির নকশা করেন। তার এই নকশাটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ‘গাহ্ফিয়া’ থেকে, যা হল এক ধরণের টুপি যেটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষ ও ছেলেরা সাধারণত পরিধান করে থাকেন।

    পড়ুন:  ২০২২-২৩ মৌসুমের জন্য শীর্ষ ১০টি সাহসী প্রেডিকশন (৬-১০)

    ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের এই স্টেডিয়ামটিতে টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায় পর্যন্ত বেশ কিছু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

    আল বাইত স্টেডিয়াম (Al Bayt Stadium)

    আল বাইত স্টেডিয়াম উদ্বোধন হয় ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে, যখন আরব কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে বাহরাইন এর মুখোমুখি হয় কাতার। অত্যাধুনিক এই স্টেডিয়ামটি অবস্থিত মধ্য দোহা থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে, আল খোর শহরে, এবং এর ধারণ ক্ষমতা অন্যান্য স্টেডিয়ামগুলির চেয়ে বেশি — ৬০,০০০।

    ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ভেন্যু হতে চলেছে আল বাইত স্টেডিয়াম। বিশাল আকৃতির এই মাঠে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশ্বকাপের মোট ৯টি ম্যাচ, যার মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচটিও রয়েছে।

    স্টেডিয়ামটির বহিরাবরণ বেশ বৈচিত্রপূর্ণ এবং মনমুগ্ধকর। এর চারপাশে তাবুর মত কিছু কাঠামো লক্ষ্য করা যায়, যার নামকরণ কি না বাইত আল শা’র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করা হয়েছে। বাইত আল শা’র হল সেসকল তাবু যা মধ্যপ্রাচ্য ও কাতারের বিখ্যাত নোমাদ গোষ্ঠীর লোকজন ব্যবহার করতেন।

    বিশ্বকাপ ফুটবল সমাপ্তির পর এই স্টেডিয়ামটির উপরিভাগ সরিয়ে নেওয়া হবে, এবং সরিয়ে নেওয়া আসনগুলি অন্যান্য দেশের নিকট দান করে দেওয়া হবে।

    স্টেডিয়াম ৯৭৪ (Stadium 974)

    স্টেডিয়াম ৯৭৪ হল একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল ফুটবল স্টেডিয়াম, যার উদ্বোধন করা হয় গত বছরের নভেম্বর মাসের ২১ তারিখে, একটি জাকজমক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এই স্টেডিয়ামে প্রথম খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত বছরের নভেম্বর মাসেরই ৩০ তারিখে। ম্যাচটি ছিল ফিফা আরব কাপ এর উদ্বোধনী ম্যাচ।

    ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ এর ভেন্যু হিসেবে এই স্টেডিয়ামটি সবচেয়ে আলাদা এবং বৈচিত্র্যময়, কারণ এর পুরো কাঠামোই তৈরি করা হয়েছে শিপিং কন্টেইনার এবং মড্যুলার স্টিল থেকে। এটি বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন প্রথম স্টেডিয়াম হতে চলেছে, যার আকার কি না চাইলেই পরিবর্তন করা যাবে। ৯৭৪ শুধুমাত্র কাতারের আন্তর্জাতিক ডায়ালিং কোডই নয়, বরং স্টেডিয়ামটির তৈরিকার্যে ঠিক সেই পরিমাণ শিপিং কন্টেইনারই ব্যবহার করা হয়েছে।

    পড়ুন:  ২০২২-২৩ প্রিমিয়ার লীগ মৌসুমে ব্রেন্টফোর্ডের শীর্ষ ১০ এ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ

    টুর্নামেন্টটির সমাপ্তির পর এই স্টেডিয়ামটিকে পুরোপুরিভাবে ভেঙে ফেলা হবে এবং অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে বলেই জানা গিয়েছে।

    আহমেদ বিন আলি স্টেডিয়াম (Ahmed Bin Ali Stadium)

    ২০০৩ সালে নির্মিত এই মনোরম স্টেডয়ামটি পূর্বে আল রাইয়ান স্টেডিয়াম নামেই পরিচিত ছিল। তবে, বেশ কিছু মেরামত কাজ এবং পুনঃনির্মাণের পর ২০২০ সালে কাতারের জাতীয় দিবসে আমির কাপ ফাইনালের দিন এটির পুনরায় উদ্বোধন করা হয়। এটি হল কাতারের স্টার্স লীগ জায়ান্টস আল রাইয়ান এসসি’র হোম মাঠ। এটি সেন্ট্রাল দোহা থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে আল রাইয়ান শহরে এবং একটি মরুভূমির ঠিক দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত।

    স্টেডিয়ামটি পুনঃনির্মাণ করার জন্য যেসকল নির্মাণ উপকরণ প্রয়োজন হয়েছিল তার ৮০ শতাংশই নেওয়া হয়েছিল স্টেডিয়ামটিতে পূর্ব থেকে অবস্থিত বিভিন্ন উপকরণ থেকে রিসাইকেল করে। এছাড়া, পুনঃনির্মাণের সময় স্টেডিয়ামের চারপাশে থাকা গাছপালাকেও কোনভাবে ক্ষতি করা হয়নি বলেই জানা গিয়েছে।

    লুসেইল স্টেডিয়াম (Lusail Stadium)

    ২০২২ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ৮০,০০০ ফুটবল ভক্ত এই স্টেডিয়ামটিতে একটি মনমুগ্ধকর আবহ তৈরি করবেন, যখন এই অত্যাধুনিক ও অসাধারণ স্টেডিয়ামটিতে অনুষ্ঠিত হবে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ। স্টেডিয়ামটির নকশা করেছেন ‘ফস্টার এন্ড পার্টনার্স’, এবং এটি অবস্থিত কাতারের লুসেইল শহরে।

    এটির উদ্বোধন করা হয় ২০২০ সালের জুন মাসে, এবং এর নকশাটি অনুপ্রাণিত হয়েছে এক ধরণের হস্ত-নির্মিত বাটির নকশা থেকে, যা কি না সভ্যতার শুরু থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামিক সাম্রাজ্য জুড়ে বেশ বিখ্যাত।

    এটি কাতারে অবস্থিত সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বেশি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়াম, এবং ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচটি এখানে বেশ আড়ম্বরের সাথেই অনুষ্ঠিত হবে বলেই আশা করা যাচ্ছে।

    Share.
    Leave A Reply