কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ এর গ্রুপ পর্বের খেলার সমাপ্তি ঘটেছে। আফকন চ্যাম্পিয়ন সেনেগালের পাশাপাশি মরক্কো এবার বিশ্বকাপের নক আউট পর্যায়ে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করবে। অপর দিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সাথে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া খেলবে এশিয়া মহাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে।

নিজেদের কনফেডারেশন এর বাইরে এই দলগুলিকে খুব একটা শক্তিশালী হিসেবে গণ্য না করা হলেও এবারের বিশ্বকাপে তারা বেশ কিছু চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব তাদের পারফর্মেন্স সম্পর্কে, এবং এটি বোঝার চেষ্টা করব যে, তারা কিভাবে এই রাউন্ড অব ১৬ পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে।

সেনেগাল (Senegal)

নেদারল্যান্ডস, ইকুয়েডর, এবং স্বাগতিক কাতারের সাথে একই গ্রুপ ছিল সেনেগাল। বিশ্বব্যাপী একাধারে ফুটবল প্রেমী, বোদ্ধা, ও বিশ্লেষকদের প্রেডিকশনকে সত্য প্রমাণিত করে নেদারল্যান্ডস এই গ্রুপটি থেকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া, তারা এটিও প্রেডিক্ট করেছিলেন যে, গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানটির জন্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ইকুয়েডর এবং সেনেগালের মধ্যে।

বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে সেনেগাল তাদের ট্যালিসমানিক ফরোয়ার্ড সাদিও মানে’কে হারায় ইঞ্জুরির কাছে। ইঞ্জুরিটি তিনি কামিয়েছিলেন তার ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে খেলার সময়। সেই ইঞ্জুরিটির কারণেই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, বিশ্বকাপে তেরাংগা লায়নস খ্যাত সেনেগাল তাদের স্বভাবসুলভ খেলাটি খেলতে পারবে না। দুর্ভাগ্যজনক সেই ইঞ্জুরিটির কারণে সেনেগাল কোচ আলিউ ছিসে’কে নিজের গেমপ্ল্যান কিছুটা হলেও পরিবর্তন করতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই যে, পুরো ব্যাপারটির ফলে সেনেগাল দলের আত্মবিশ্বাস কিছুটা হলেও কমেছিল। সাদিও মানে খুবই ভালো একটি বছর পার করছিলেন, ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। এছাড়াও তিনি ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় এনুয়াল পুরষ্কার ব্যালন ডি’অর ২০২২ এ (পুরুষ) শুধুমাত্র কারিম বেঞ্জেমার পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। মানে দলে থাকলে তারা সেই আত্মবিশ্বাসটি মনে ধারণ করতে পারতো যে, ২০০২ সালে তারা যে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছিল, এবার তারা সেটিকেও অতিক্রম করে যেতে পারবে।

ছিসে’র জন্য এটি একটি অত্যন্ত বৈচিত্র‍্যপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল, কেননা সাধারণত তিনি যে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষদের বিধ্বস্ত করতে বিশ্বাসী সেখান থেকে সরে এসে তাকে দলের পুরো গঠনটিই পরিবর্তন করে ফেলতে হয়। মানে’র অনুপস্থতিতে মিডফিল্ডকে আরো জোরদার করতে তাকে ৪-৩-৩ ফর্মেশন থেকে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে সরে আসতে হয়। কিন্তু, যেহেতু নেদারল্যান্ডস এমন একটি দল যাদের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সে পজিশন রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অসংখ্য উন্নতমানের খেলোয়াড় উপস্থিত, সেহেতু তাদের বিপক্ষে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ঐ সেনেগাল।

পড়ুন:  চেলসিতে খেলতে আসা বেশির ভাগ স্ট্রাইকাররা কেন সফল হতে পারেন না?

তবে, এই ম্যাচটি শেষে তারা যথেষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করে, এবং মিডফিল্ডে ভারসাম্য অনেকটা বাড়িয়ে পরের দুইটি ম্যাচ বেশ সহজেই জিতে নেয়। ফলে, তারা গ্রুপ পর্যায় থেকে অগ্রসর হয়, এবং রাউন্ড অব ১৬ তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায়।

অস্ট্রেলিয়া (Australia)

২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া একবারও বিশ্বকাপের নক আউট পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, এবং এবারের কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ এর শুরুতেও তাদের দল দেখে কারোরই মনে হয়নি যে, তারা এবার গ্রুপ পর্ব পার করতে পারবে।

ফ্রান্স, তিউনিশিয়া, এবং ডেনমার্কের সাথে একই গ্রুপে থাকায় অনেকেই প্রত্যাশা করেছিল যে, গ্রুপ পর্ব শেষে অজি’রা এই গ্রুপটির তলানিতে থাকবে, বা ভাগ্য ভালো থাকলে তৃতীয় স্থানে থাকবে (যদিও সেক্ষেত্রে তারা ভেবেছিল যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটির সাথে অজি’দের পয়েন্টের ব্যবধান হবে বিশাল)। তারা শুধু সেসব প্রেডিকশনকে ভুলই প্রমাণিত করেনি, বরং তারা ডেনমার্কের মত একটি শক্তিশালী দলকে বেশ কায়দা করেই হারিয়ে দেয়, যাদেরকে কি না টুর্নামেন্টের শুরুতে ডার্ক হর্স হিসেবে মানা হয়েছিল।

অনেকে এটি বলতে পারেন যে, খুব বাজে ফুটবল খেলে অস্ট্রেলিয়াকে তিনটি পয়েন্ট উপহার দিয়েছিল তিউনিশিয়া। তবে, তিউনিশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিতেই বোঝা গিয়েছিল যে, এই অস্ট্রেলিয়া দলটি তাদের নিজেদের দক্ষতা ও ক্ষমতা সম্পর্কে কতটা স্পষ্ট ধারণা রাখে, এবং সময় আসলেই তারা কিভাবে নিজেদের দূর্বলাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারে।

গ্রুপ ‘ডি’ এ নিজেদের তিনটি ম্যাচেই তাদের বল পজিশন প্রতিপক্ষের তুলনায় কম ছিল। এছাড়াও, প্রতিপক্ষের তুলনায় সেই ম্যাচগুলিতে তাদের শট সংখ্যা, পাস সংখ্যা, পজিশন স্ট্যাটস, এবং বল নিয়ে প্রতিপক্ষের ডি বক্সে ঢোকার সংখ্যাও অনেকটাই কম ছিল। তবে, তারা নিজেদের কর্মদক্ষতার দিকে বেশি নজর দিয়েছিল, এবং এটি নিশ্চিত করেছিল যে তাদের রক্ষণভাগ যেন সর্বক্ষণ সজাগ থাকে।

বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হাতে ৪-১ গোলে ধরাসয়ী হওয়ার মধ্যে কোনই লজ্জা নেই। এছাড়া, ম্যাচটির ফলাফল তাদের জন্য আরো বাজেও হতে পারতো। তবে, তারপর থেকে অসাধারণ ফুটবল খেলে সকারুজ’রা প্রমাণ করে যে, তারা শুধুমাত্র অনেক কষ্টে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে খুশি থাকা একটি দলই নয় (এবারও এএফসি রিজিওন থেকে প্লে অফ খেলার মাধ্যমে তারা বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়), এবং তারা এবারের বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬ তেও নিজেদের নামটি লিখিয়ে ফেলে, যদিও সেখানে তারা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটুর জন্য অঘটন ঘটাতে ব্যর্থ হয়।

পড়ুন:  গেমসপ্তাহ 33 এর জন্য FPL সেরা বাছাই

জাপান (Japan)

এবারের বিশ্বকাপের দুইটি গ্রুপ অব ডেথ এর মধ্যে একটিতে স্পেন, জার্মানি, এবং কোস্টা রিকা’র সাথে জায়গা করে নিয়েছিল জাপান। গত ছয়টি বিশ্বকাপে জাপান একান্তই তাদের নিজস্ব একটি প্যাটার্ন তৈরি করে নিয়েছিল। সকলের প্রত্যাশা ছিল এই যে, জাপান যে করেই হোক সেই প্যাটার্নটি অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ্য হবে।

১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ পর্যায়ে অভিষেক করার পর থেকে প্রত্যেকটি বিশ্বকাপ আসরেই উপস্থিত থেকেছে জাপান। তবে, এই সময়কালে তারা শুধুমাত্র গ্রুপ পর্যায় ও রাউন্ড অব ১৬ পর্যায়েই খেলতে পেরেছে। সর্বশেষ ২০১৮ বিশ্বকাপেও তারা রাউন্ড অব ১৬ তে পৌঁছায়, এবং পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও প্যাটার্ন অনুসরণ করে সেখান থেকেই বিদায় নেয়। তবে, এবারের ২০২২ বিশ্বকাপে অনেকেই প্রেডিক্ট করেছিল যে, তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেবে।

এছাড়া, স্পেন এবং জার্মানির সাথে একই গ্রুপে থাকাটাও তাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক বিষয়ই ছিল, কারণ উভয় দলকেই এবারের বিশ্বকাপের শীর্ষ ৫টি ফেভারিটদের মধ্যে গণ্য করা হয়েছিল, যারা ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলার জন্য কাতারে লড়তে গিয়েছিল।

তবে, তারা জার্মানির বিপক্ষে একটি বিষ্ময়কর জয় দিয়ে টুর্নামেন্টটি শুরু করে, যদিও পরের ম্যাচে তারা স্বল্প ব্যবধানে কোস্টা রিকা’র বিপক্ষে হেরে যায়। এরপর স্পেনের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচেও তারা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ম্যাচটি জিতে নিয়ে তারা ২ পয়েন্টের ব্যবধানে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে অগ্রসর হয়, যেখানে স্পেন ও জার্মানি যথাক্রমে গ্রুপের ২য় ও ৩য় স্থানে থেকে গ্রুপ পর্যায় শেষ করে।

উভয় ম্যাচেই জাপানের ক্রীড়াকৌশল ছিল বেশ সহজ-সরলঃ ঠিকমত ডিফেন্স কর, এবং সুযোগ পেলেই কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে এমনভাবে আঘাত কর যেন সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই তাদের অনেকটা সময় ব্যয় হয়ে যায়। নিজেরা গোল না পাওয়া পর্যন্ত এই কৌশলটি তারা প্রয়োগ করেই গিয়েছে। বিশ্বকাপে তাদের লক্ষ্যও ছিল বেশ সহজ-সরলঃ তারা এক সময় এশিয়ার সবচেয়ে বড় দল হিসেবে গণ্য হতো, তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তারা সেই উপাধিটি হারিয়েছে, এবং সেটি তারা পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া।

এখন বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬ তে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তারা আরো একটি ঝড়ো পারফর্মেন্স দিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায়ে খেলার স্বপ্নে মশগুল থাকারই কথা। লোকে যাই বলুক না কেন, এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার থেকে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে এই জাপান দলটিকে।

পড়ুন:  ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লীগঃ এমন ১০ জন খেলোয়াড় যাদেরকে আপনার এখনই দলে নেওয়া উচিৎ

মরক্কো (Morocco)

এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি চমক সৃষ্টি করেছে আফ্রিকার আটলাস লায়নস খ্যাত মরক্কো। তারাই সৃষ্টি করেছে সবচেয়ে বেশি আলোচনার পয়েন্টও। যদিও, যারা তাদেরকে গত কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করে আসছেন, তাদের কাছে এই সাফল্যটিকে মোটেও আকষ্মিক মনে হওয়ার কথা নয়।

বর্তমান ফিফা বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে শুধুমাত্র সেনেগালের থেকেই পিছিয়ে রয়েছে মরক্কো, এবং সেটির মূল কারণই হল এই যে, এবছরের শুরুতে আফ্রিকান নেশনস কাপ ২০২২ এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তেরাংগা লায়নস খ্যাত সেনেগালিজ’রা। এছাড়া, বিশ্বকাপ শুরুর কিছুদিন আগেই মরক্কো তাদের সাবেক কোচকে চাকরিচ্যুত করে। বিভিন্ন রিপোর্টে শোনা গিয়েছে যে, তিনি ছিলেন খুবই রক্ষণাত্মক একজন কোচ, এবং খেলোয়াড়দেরকে অনেক শাসন করে নিয়মের অধীনে আনতেন, এবং সেজন্যই তাকে অনেক খেলোয়াড়, স্টাফ ও সমর্থকরা পছন্দ করতেন না।

তবে, তারপরও বিশ্বকাপ শুরুর এত কম সময় পূর্বে তাদের দীর্ঘকালীন সেই কোচকে চাকরিচ্যুত করাটা বেশ ঝুকিপূর্ণই ছিল বটে। এরপর দলটির দায়িত্ব যায় মরক্কোরই এক সাবেক মিডফিল্ডার ওয়ালিদ রেগ্রাগুই এর কাছে। রেগ্রাগুই খুব জলদি দলটির সংঘবদ্ধতাকে আবার ফিরিয়ে আনেন, এবং এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে আবার দলে সুযোগ দেন যাদেরকে শুধুমাত্র কিছু ছোটখাট নিয়ম ভঙের কারণে দল থেকে দূরে রেখেছিলেন আগের কোচ মহাশয়। নবনির্মিত এই দলবদ্ধতার মধ্য দিয়ে রেগ্রাগুই মরক্কোর খেলোয়াড়দেরকে নিজেদের জন্য নয়, বরং তাদের সতীর্থদের জন্য খেলতে শেখান।

সেই মনোভাবের প্রতিফলন তারা এবারের বিশ্বকাপে দেখাতে পেরেছে। এ পর্যন্ত চলমান বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে মনে হয়েছে এই মরক্কোকেই। তারা যেমনি গতিশীল সব আক্রমণে লিপ্ত হয়েছে, তেমনি অসাধারণ ডিফেন্ডিং করে নিজেদের গোল পোস্ট বিপদমুক্ত রেখেছে। পরের রাউন্ডে যাওয়ার তাদের স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দলের প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ই নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

এখন তারা রাউন্ড অব ১৬ পর্যায়ে স্পেনের বিপক্ষে খেলতে নামবে, যাদের সাথে তাদের ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়া রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পূর্ববর্তী ইতিহাস রয়েছে। মরক্কোর ফুটবলীয় ইতিহাসে তারা বিশ্বকাপের মঞ্চে এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হয়তো পায়নি কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার, তাই তারা এই সুবর্ণ সুযোগটিকে কাজে লাগানোর জন্য মরিয়া হয়ে থাকবে।

Share.
Leave A Reply