রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ সারা পৃথিবীর মানুষের নানান কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাঘাতও ঘটিয়েছে। ফুটবলও সেই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিশেষ করে ইংলিশ ক্লাব চেলসি’র বর্তমান বিরূপ পরিস্থিতি তাদের ভক্তদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

 

রোমান আব্রামোভিচ, যিনি কিনা ২০০৩ সাল থেকে চেলসি’র মালিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, হচ্ছেন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের খুবই ঘনিষ্টদের মধ্যে একজন, অথবা এমনটি সন্দেহ করছে ব্রিটিশ সরকার। এবং তারই ভিত্তিতে, ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডে আব্রামোভিচের সব সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষনা করেছে ব্রিটিশ সরকার, যার মধ্যে অন্যতম হল চেলসি ফুটবল ক্লাব।

 

ব্লুস’রা আব্রামোভিচকে বিদায় জানাচ্ছে এমন একটি নাটকের মধ্য দিয়ে, যে নাটক ফুটবল বিশ্ব আজীবন মনে রাখবে, এবং যে গল্প ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

 

*INSERT CHELSEA FLAG OR STAMFORD BRIDGE PICTURE*

 

রোমান আব্রামোভিচ একজন এমন মালিক যিনি তার দলের ম্যানেজার এবং খেলোয়াড়দের কাছে থেকে একদম পুরোটা প্রচেষ্টা আশা করে থাকেন। ফুটবলের ক্ষেত্রে বা দল তৈরির ব্যাপারে তার কাছে আনুগত্যের কোনই দাম নেই, এবং যে একমাত্র জিনিসটি তিনি মনেপ্রানে চান, সেটি হচ্ছে শিরোপা।

 

কিন্তু এতদিনের মালিক চলে গেলে এখন চেলসি’র কি হবে? নতুন এসকল শাস্তির অনুমোদনকালীন সময়ে চেলসি ক্লাবটি চলবে কিভাবে? চলুন দেখে নেওয়া যাক লন্ডনারদের সম্ভাব্য সকল শাস্তিবিধান এবং সম্ভাব্য অসুবিধাগুলি কি কি হতে পারে।

 

আব্রামোভিচ এবং চেলসি’র উপর আরোপিত শাস্তিসমূহ (Sanctions on Abramovich and Chelsea)

ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা স্কাই স্পোর্টসের তথ্য মোতাবেক, ব্রিটিশ সরকার আব্রামোভিচকে কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছে এবং ইউকে-এর অভ্যন্তরীন তার সকল সম্পদ আটকে দিয়েছে।

 

এক্ষেত্রে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্রিটেনের মাটিতে এই রাশিয়ান বিলিওনেয়ারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হচ্ছে চেলসি ফুটবল ক্লাব।

 

শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও একই রকম শাস্তির শিকার হচ্ছেন আব্রামোভিচ। সেখানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে একটি নকল ফান্ডের মাধ্যমে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের।

 

এই রাশিয়ান কোটিপতির বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তিগুলোর একটি মজার দিক হল তাকে জরিমানা বা গ্রেপ্তারের ভয় না দেখিয়ে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দিকেই বেশি মনযোগ দেওয়া হচ্ছে, এবং তিনি তাতে সম্পূর্ণরূপে অসন্তুষ্ট এবং এমন শাস্তি এড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তার এই প্রচেষ্টার উদাহরণস্বরূপ তিনি তার ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রমোদতরী বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য নিরাপদ স্থান তুরস্কে নিয়ে গিয়ে ভিড়িয়েছেন। তুরস্ক একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র হলেও তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্গত নন। তাই ইউরোপের অন্যান্য দেশ রাশিয়ান বিলিওনেয়ারদের বিরুদ্ধে যেসব শাস্তি আরোপ করছে, তুরস্কের ক্ষেত্রে সেগুলি প্রযোজ্য নয়। তাই তুরস্কই হিয়ে উঠেছে আব্রামোভিচের মত আরো অনেকেরই ভরসার স্থান, যেখানে তারা কিছুক্ষণের জন্য তরী ভিড়িয়ে পরবর্তী ধাপের পরিকল্পনা করতে পারছেন।

 

এখন চেলসি ফুটবল ক্লাবের উপর আরোপিত শাস্তিবিধানগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ক্লাবটি নতুন কোন মালিক খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তাদের ক্লাব মার্চেন্ডাইজ (অফিসিয়াল স্টোরের সেলস্) এবং টিকেট বিক্রির টাকার কোনটিই নিজেদের পকেটে ঢুকাতে পারবে না, যেটি ক্লাবটির বাৎসরিক আয়ের একটি বিশাল অংশ।

 

পুরো শাস্তির উদ্দেশ্য একটিই, যেটি খুবই সহজ এবং সরল। তা হচ্ছে, কোন প্রকার অর্থ যেন চেলসি ক্লাবের মাধ্যমে বা কোনভাবে রোমান আব্রামোভিচের পকেটে না ঢোকে, যা তিনি পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন।

 

এছাড়াও, কাটা গায়ে নূনের ছিটা দিতে চেলসিকে কোন প্রকার ট্রান্সফার করা থেকে, কোন খেলোয়াড়ের চুক্তি পুনঃনবীকরণ থেকে এবং ক্লাব স্টোর থেকে কোন প্রকার মার্চেন্ডাইজ বিক্রয় থেকে ব্রিটিশ সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

 

যদিও চেলসির কর্মকর্তারা এইসব শাস্তি নিবারণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন, তবে ইতিমধ্যে ক্লাবটির অনেক ভক্ত-সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং খেলোয়াড়েরা এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

পড়ুন:  এরিক তেন হাগঃ যেভাবে এই ডাচ ম্যানেজার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলার উন্নতিসাধন করেছেন

 

বর্তমানে এমনটিই মনে হচ্ছে যে, প্রথমে যা ভাবা হয়েছিল চেলসি ফুটবল ক্লাবকে বিক্রয় করার প্রক্রিয়াটিতে তার চেয়ে বেশি সময়ই অতিবাহিত হতে যাচ্ছে, কারণ ব্রিটিশ প্রশাসন একদমই চান না যেন আব্রামোভিচ এই প্রক্রিয়ার সাথে কোনভাবেই সংযুক্ত হোন। আর তাকে ছাড়া এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে অনেক পুরানো কাগজপত্র ও তথ্যাদি খুজে বের করতে হবে এবং সত্যায়িত করতে হবে, যা অনেক সময়সাপেক্ষ।

 

যখন থেকেই এই ঘোষণা বা খবরটি প্রকাশিত হয়েছে, তখন থেকেই বিশ্বের আনাচে কানাচে সকল স্থানে ফুটবল বোদ্ধারা এবং সমর্থকরা এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও কঠোর পর্যালোচলায় লিপ্ত হয়ে পড়েছেন।

 

চেলসি ভক্তরা বদ্ধপরিকর যে তারা এই সমস্যাবহুল সময়টি দুঃসাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করতে পারবেন। কিন্তু এই পরিস্থিতির সাথে সাথে যে অনিশ্চয়তা এসে পড়ে তা তাদেরকে বেশ চিন্তিতও করে তুলছে।

 

পরিস্থিতিটি চেলসি খেলোয়াড়দেরকেও করছে বেশ চিন্তিত, যদিও তারা নিজেদেরকে নিবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং ভক্তদের জন্য দলের সবগুলো ম্যাচ জেতার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

 

চেলসি’র আমেরিকান ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে থাকাকালীন বলেছিলেন, “সত্যি বলতে, পরিস্থিতিটি খুবই জটিল। কিন্তু আমরা চেষ্টা চালিয়ে চাচ্ছি যেন আমরা শুধু আমাদের খেলার উপরই মনযোগ রাখতে পারি, এবং মাঠে সেটির প্রতিফলন ঘটাতে পারি।”

 

এরই মধ্যে এই অভিব্যক্তিটিও উঠে এসেছে যে প্রিমিয়ার লীগ কর্তৃপক্ষের আরো সচেতন ও স্বচ্ছ হওয়া উচিৎ কোন নতুন মালিকের নিবন্ধনের সময় যথাযথ স্ক্রিনিং করানোর ক্ষেত্রে। সেরকম স্বচ্ছ একটি স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে চেলসি’র মত রাজনৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতিতে পড়া থেকে অন্য কোন দলকে বাঁচিয়ে রাখবে।

 

এটি খুবই অবাক করার মতই একটি বিষয় যে, বিশ্বের সবচেয়ে দামী ও মূল্যবান দলগুলোর মধ্যে ৭ম স্থানে থাকা দলটি, যারা কিনা সর্বোচ্চ ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, তাদের বর্তমানে টিকে থাকার জন্য একটি বিশেষায়িত সরকারী লাইসেন্সের আয়তায় কাজ করতে হচ্ছে।

 

এতকিছুর পরেও, চেলসি ম্যানেজার থমাস টুখেল আস্থা রাখছেন চেলসির প্রশাসনের উপর। তার শুধু একটিই আশা, যেন খেলোয়াড় কেনাবেচার লড়াইয়ে যেন আগামী ট্রান্সফার সিজনে চেলসির হাত পুরোপুরিভাবে বাঁধা না থাকে।

 

অফিসিয়াল বিবৃতিসমূহ (Official Statements)

যুক্তরাজ্য সরকার একটি অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলেছেন, “চেলসিকে দেওয়া সরকারী লাইসেন্সটির প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে খেলোয়াড়দেরকে নিরাপদ রাখা, ইংলিশ ফুটবলকে রক্ষা করা, এবং প্রিমিয়ার লীগ, অন্যান্য লীগসমূহ ও অনুগত ভক্তদের রক্ষা করা। অধিকন্তু, আমরা যদি চেলসি ফুটবল ক্লাবকে নিয়ে বিস্তারিত বলতে যাই, তাহলে বলতে হবে যে, জনাব আব্রামোভিচকে কোনভাবেই যুক্তরাজ্যের দ্বারা তার উপর আরোপিত কোন শাস্তি থেকে মওকুফ করা হবে না। তিনি এই ক্লাবটির মালিকানা থেকে আর কোন প্রকার লভ্যাংশ হাসিল করতে পারবেন না।”

 

অপরদিকে, চেলসি নিজেরাও প্রেসের কাছে নিজেদের বিবৃতি দিতে বেশি দেরি করেননি। তারা তাদের বিবৃতিতে বলেছেন, “চেলসি ফুটবল ক্লাব যুক্তরাজ্য সরকারের সাথে প্রতিনিয়ত আলোচনা করে যাচ্ছে এই বিশেষায়িত লাইসেন্সটির প্রসার ও কর্মক্ষেত্র নিয়ে। বর্তমানে আমাদের মধ্যকার কথোপকথনসমূহের মুল উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই লাইসেন্সটিকে সংশোধন করার অনুমতি চাওয়া। আমাদেরকে যদি সেই অনুমতিটি দেওয়া হয়, তবে আমাদের ক্লাবটি আবারো আগের মত করে আমরা চালাতে পারব বলে মনে করছি।”

 

আমরা যেমনটি ইতিমধ্যে বলেছি, রোমান আব্রামোভিচ এই নতুন সরকারী লাইসেন্স অনুযায়ী চেলসি ফুটবল ক্লাবকে বিক্রয় করতে পারবেন না। তবে, ইংল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বরিস জনসন, আশ্বাস দিয়েছেন যে, সরকার হয়তো চেলসিকে আরো একটি বিশেষ লাইসেন্সের আওতায় আনার চেষ্টা করবে, যেটি আব্রামোভিচকে সুযোগ ও অনুমতি দিবে ক্লাবটিকে চিরজীবনের জন্য বিক্রয় করে দেওয়ার। অর্থাৎ, তিনি ভবিষ্যতে আর কখনোই এই ক্লাবটি কিনতে পারবেন না।

পড়ুন:  ট্রান্সফার মার্কেটের অরাজকতার জন্য প্রিমিয়ার লীগের ক্লাবগুলিই দায়ী!

 

তবে, এখন পর্যন্ত, সর্বশেষ যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তা মোতাবেক, এই বিক্রয়টিকে পরিপূর্ণতা দিতে যে কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে (রেইন গ্রুপ), তারা এই প্রক্রিয়াটিকে যথাযথভাবে দেখাশুনা করছেন। কিন্তু, অবশ্যই, এখন পর্যন্ত চেলসির উপর বেষ্টিত লাইসেন্সেটি মোতাবেক, ক্লাবের বিক্রয়মূল্য থেকে ১ পয়সাও আব্রামোভিচের পকেটে ঢুকবে না।

 

সর্বশেষ তথ্য অবুযায়ী, একজন আগ্রহী ক্রেতা হচ্ছেন বিখ্যাত প্রপার্টি টাইকুন, নিক ক্যান্ডি। বিভিন্ন সূত্রের মতে, তিনি চেলসিকে কিনতে ২ বিলিয়ন পাউন্ডের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করতে রাজি আছেন, এবং এমনি একটি প্রস্তাব তিনি সরকারের কাছেও রেখেছেন।

 

এই অবধি, চেলসি তাদের সকল খেলোয়াড় ও স্টাফদের বেতন, এলাউন্স, ও পেনশন দিতে হিমসিম খায়নি, বরং সাধারন প্রক্রিয়াতেই তা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা সরকারের তদারকির আওতায় ট্রান্সফার মার্কেটেও নামতে পারবে, যেখানে কিনা খেলোয়াড়দের কেনা বেচা সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে, খেলোয়াড় বিক্রয় থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি চেলসি ফুটবল ক্লাবের নিকট যাবে, যার লেনদেনও সরকারের তদারকির আওতায় থাকবে। খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে, তাদেরকে সরকারের নিকট ফান্ডিং চেয়ে দরখাস্ত করতে হবে, এবং তা মঞ্জুর হলেই শুধুনাত্র সেই খেলোয়াড়টিকে কিনতে পারবে।

 

অধিকন্তু, চেলসিকে তাদের টেলিভিশন ডিস্ট্রিবিউশন এবং পারফর্মেন্স ফি থেকে পাওয়া পুরো অংকটিই নিজেদের কাছে রাখতে দেওয়া হবে। যদিও সরকারী লাইসেন্সটি টিকেট বিক্রির অর্থ ভোগ থেকে চেলসিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যেসকল ভক্তরা সিজন টিকেট কিনেছিলেন, তারা নির্বিঘ্নে সিজনের বাঁকি ম্যাচগুলি দেখতে পারবেন স্টেডিয়ামে বসে, এবং সেসকল সিজন টিকেটের টাকা চেলসি ফুটবল ক্লাব নিজের কাছেই রাখতে পারবে।

 

সম্ভাব্য প্রস্থানকারীরা (Possible Departures)

এখনকার মত, ক্লাবটির ফুটবলকেন্দ্রিক বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে দিকটি নিয়ে কথা হচ্ছে তা হচ্ছে ট্রান্সফার মার্কেট। আমরা যেমনটি আগেই জানিয়েছি যে, ক্লাবের কোন খেলোয়াড় বা কোচই তাদের চুক্তি পুনঃনবীকরণের জন্য ক্লাবটির সাথে কথা বলতে পারবে না। এবং সে কারণেই, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এখন স্বয়ংক্রীয়ভাবে তাদের ট্রান্সফার লিস্টে প্রবেশ করে ফেলেছে।

 

বিভিন্ন গুজব এবং অফিসিয়াল রিপোর্ট অনুসারে, চেলসি অধিনায়ক চেজার অ্যাজপিলিকুয়েতা পরবর্তী মৌসুমে বার্সেলোনায় যোগ দিতে চলেছেন। জার্মান ডিফেন্ডার এন্তনিও রুডিগার, যিনি এসকল শাস্তিবিধানের পূর্বেই চেলসির ট্রান্সফার লিস্টে ছিলেন, তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বড় দল উঠে পড়ে লেগেছে, এবং তিনি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব শীঘ্রই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন বলে জানা গিয়েছে।

 

আরেকজন চেলসি খেলোয়াড় যাকে অতি শীঘ্রই বার্সেলোনার লাল-নীল জার্সিতে দেখা যাবে বলে মনে হচ্ছে, তিনি হলেন ড্যানিশ ডিফেন্ডার আন্দ্রেয়াস ক্রিশ্চেনসেন। এই উদীয়মান ডিফেন্ডার পরবর্তী গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে বার্সায় যোগ দিতে চলেছেন, তাও আবার একদম বিনামূল্যে (ফ্রি ট্রান্সফার)!

 

এছাড়া, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, চেলসির ম্যানেজার থমাস টুখেলের নাম এসকল গুজবের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে, যা ক্লাবটির জন্য একদমই সুখকর নয়।

 

*INSERT THOMAS TUCHEL PHOTO HERE*

 

গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা জেতা সত্বেও, সাবেক পিএসজি কোচ থমাস টুখেলের আওতায় চেলসি এবছর শুধুমাত্র একজন বড় মাপের খেলোয়াড়কেই দলে ভিড়াতে সক্ষম হয়, যিনি হচ্ছেন রোমেলু লুকাকু।

 

আপনি যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগীতা জিতে নেন, এবং এর পরে যদি আপনার ক্লাব আপনাকে শুধুমাত্র একজন বড় মাপের খেলোয়াড়কে কেনারই অর্থ প্রদান করে, তবে আপনি কিছুটা মনক্ষুন্ন হবেন এটিই স্বাভাবিক। এবং এখন, এই সকল শাস্তিবিধান এবং ক্লাব নিয়ে টানা-হেঁচড়া টুখেল বা চেলসি কারোরই জন্য খুব বেশি সুখকর হওয়ার কথা নয়।

 

যেহেতু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একজন নতুন ম্যানেজার এর সন্ধানে লিপ্ত, কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ বা ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার রাল্ফ রাঙনিক এর দায়িত্ব এই মৌসুমের সমাপ্তির সাথেই শেষ হতে চলেছে, থমাস টুখেলও তাই তাদের সম্ভাব্য নতুন ম্যানেজারদের তালিকায় ঢুকে পড়েছে।

পড়ুন:  প্রিমিয়ার লীগ ম্যাচউইক 32 অ্যাওয়ার্ডস

 

যদিও অনেকদিন থেকেই এরিক টেন হাগ বা মৌরিসিও পচেত্তিনোকে ম্যান ইউনাইটেডের ভবিষ্যৎ ম্যানেজারের পজিশনে ফেভারিট ধরা হয়ে আসছিল, সবাইকে চমকে দিয়ে থমাস টুখেলকে নিয়োগ করলেও সেটি ইউনাইটেডের দিকে থেকে মোটেও খারাপ হবে না। এবং যদি একটু চিন্তা করে দেখা হয়, তবে এই নিয়োগটি খুব একটা বিষ্ময়করও হবে না, কারণ রাঙনিকের সাথে টুখেলের অনেক আগে থেকেই পরিচয় এবং খুব ভালো সম্পর্ক। আর এছাড়া, টুখেল নিজেই বলেছেন যে, ইংল্যান্ড এবং বিশেষ করে লন্ডন তার খুবই পছন্দের একটি আবাসভূমি।

 

যদি এই গুজবটি সত্য হয়, এবং সত্যি সত্যিই টুখেল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন, তবে তিনি হবেন ইতিহাসের দ্বিতীয় ম্যানেজার যিনি চেলসিতে কোচিং করানোর পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে কোচিং এর দায়িত্ব দেন। তার আগে এই কাজটি করেছেন পর্তুগিজ ম্যানেজার, হোসে মৌরিনহো।

 

আলোচনার আরেকটি মুখ্য বিষয় হচ্ছে ভ্রমন খরচ। অ্যাওয়ে ম্যাচে খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যয় এর সীমা হচ্ছে ২০,০০০ পাউন্ড। আরেক দিকে, ঘরের মাঠে ম্যাচের খরচের ক্ষেত্রে, যার মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা বাবদ খরচ, ক্যাটারিং বাবদ খরচ, এবং স্টিওয়ার্ডিং বাবদ খরচ ইত্যাদি, দেখা যাচ্ছে যে পরিমানণটি গিয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতি ম্যাচে প্রায় ৫,০০,০০০ পাউন্ডের কাছাকাছি।

 

পরিশেষে, এই মর্মে লাইসেন্সটিতে সর্বশেষ যে নিষেধাজ্ঞা বা বাঁধাটি দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে ক্লাব মার্চেন্ডাইজ সংক্রান্ত। সকল তৃতীয় পক্ষ যারা ১০ মার্চের (যেদিন চেলসি ও আব্রামোভিচের উপর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল) আগে ক্লাবটির জন্য মার্চেন্ডাইজ প্রস্তুত করেছে, তাদেরকে তাদের মার্চেন্ডাইজ বিক্রয় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

 

তবে, এক্ষেত্রে সরকারী লাইসেন্সটির শর্ত মোতাবেক, এসকল বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ বা তার লভ্যাংশ চেলসি ফুটবল ক্লাব বা রোমান আব্রামোভিচের মধ্যে কেউই পাবে না।

 

সবকিছু পর্যালোচনা করে বলা যায় যে, একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চেলসি হয়তো এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারবে, কিন্তু চলার পথে এই পরিস্থিতি থেকে গড়ে ওঠা চাঞ্চল্য একটি বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে খেলোয়াড় এবং স্টাফ উভয়ের উপরেই।

 

ভবিষ্যৎ পরিণতি (Future Repercussions)

এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই যে, আব্রামোভিচের মালিকানায় চেলসি খুবই সফল সময় পার করেছে। ১৯ বছরে ২১টি শিরোপা জেতার কৃতিত্ব এই আব্রামোভিচের আওতায় সময়কালকে লন্ডনারদের ইতিহাসের সেরা সময়কাল হিসেবে নির্দ্বিধায় সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

 

*INSERT ABRAMOVICH LIFTING CHAMPIONS LEAGUE HERE*

 

তাই, এটি এখন দেখার বিষয় যে চেলসি কিভাবে তাদের সর্বে সর্বা রাশিয়ান মালিককে অতীতে ফেলে নতুন দিগন্তের দিকে পা বাড়ায়।

 

অবেক ফুটবল বোদ্ধাই মনে করছেন যে, চেলসি আবার সেই অবস্থায় ফিরে যাবে, যে অবস্থায় তারা ছিল আব্রামোভিচ ক্লাবটি কেনার আগে, অর্থাৎ একটি শীর্ষ-৫ বা শীর্ষ-৬ এ থাকার উপযুক্ত দল। তবে, বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞরাই মনে করছেন যে, চেলসি ওতটা বড় কোন সমস্যায় পড়েইনি যতটা বড় সেটিকে দেখে মনে হচ্ছে, বা মনে করানো হচ্ছে।

 

খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না যখন আরেকজন ফুটবলীয় বিকিওনেয়ার মালিক এসে চেলসির দরজায় কড়া নাড়বেন, বিশাল বড় ব্যাংক ব্যালেন্স প্রদর্শন করবেন, ক্লাবটি কিনে ফেলবেন, এবং চেলসির পূর্ববর্তী উচ্চ মান বজায় রেখে ক্লাবটি পরিচালনা করবেন।

 

নতুন মালিক হিসেবে যিনিই আসুক, আমরা জানি না তিনি আব্রামোভিচের মত সফলতার জন্য মরিয়া হবেন কিনা, তবে এ ব্যাপারে আমরা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত যে চেলসি প্রিমিয়ার লীগের রুই কাতলাদের মধ্যেই একটি হয়ে থাকবে, এবং অদূর ভবিষ্যতে তাদের চুনোপুঁটি হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি না। নতুন মালিকানায়ও চেলসি গত দুই দশকের মতই সকল প্রতিযোগীতায় জেতার জন্যই খেলবে বলেই আমরা মনে করি।

Share.
Leave A Reply